অণুবীক্ষণ- দশ নির্দেশিকা

আমার আজকের কাহিনী যাঁকে নিয়ে তাঁর নাম সত্যভাই কাশীভাই পাটকিল। আপনারা অনেকেই হয়তো তাঁর নাম শোনেননি। পাটকিল সাহেব ছিলেন একজন প্রকৃত জাতীয়তাবাদী, প্রকৃত ব্রহ্মচারী এবং প্রকৃত নির্লোভ। আপনারা অনেকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ছবি দেখেছেন। যাঁকে এখন গোটা দেশ মহাত্মা গান্ধী বলে ডাকে। তাঁর অনেক ছবিতেই ওনার আশেপাশে চশমা চোখে একজন সুদর্শন প্রৌঢ়কে দেখতে পাবেন। তিনিই পাটকিল সাহেব। পাটকিল সাহেব ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি আপোষ পছন্দ করতেন না। পাটকিল সাহেব ব্রিটিশদের কড়া ধাঁচের শাসন খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু যেদিন থেকে গান্ধীজীর সাথে গলা মিলিয়ে ব্রিটিশকে ভারত ছাড়ার ডাক দিয়েছিলেন তারপর থেকে কোনোদিনও ব্রিটিশদের সমর্থন করেননি।

আবার ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনে গান্ধীজীর কলকাতায় বেলেঘাটার বস্তির একটি ঘরে নিজেকে লুকিয়ে রাখা ও তাঁর শোকপ্রকাশ পছন্দ করতে পারেননি। তাই আততায়ীর গুলিতে গান্ধীজীর মৃত্যুর পরে তিনি প্রকাশ্যে গভীর সন্তাপ দেখিয়ে এসে গোপনে নিজের বাড়িতে উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সুতরাং পাঠক বুঝতেই পারছেন তিনিই বর্তমান রাজনীতির পুরোধা বা জনক। তিনি জাতির জনকও হতে পারতেন কিন্তু মাঝখান থেকে সুভাষ বোস গান্ধীজীকে জাতির জনক বানিয়ে ছেড়ে দিলেন। পাটকিল সাহেব অনুমান করতে পেরেছিলেন যে এই দেশের জাতির জনক গুজরাট থেকেই হবে। অন্য এক গুজরাটি মহম্মদ আলি জিন্না পাকিস্তানের জাতির জনক হয়ে গেলেন। তাতে ওনার কোনো ক্ষোভ ছিল না।

বরং মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ হওয়াতে স্বস্তি পেয়েছিলেন। উনি গান্ধীজী আর নেহেরুকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে দেশের সমস্ত মুসলিম জনগণকে শান্তিমতো ওই দেশে পাঠানোর বন্দোবস্ত করতে। কারণ উনি ছিলেন সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী। যদিও জানতেন ওঁরা শুনবেন না। পাটকিল সাহেব শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন হিন্দুস্তান, পাকিস্তানের সঙ্গে আরেকটা দেশ গড়ে তুলতে পাটকিলস্তান। কাশ্মীরের রাজা আর হায়দ্রাবাদের নিজামের থেকে কিছুটা জমিও আদায় করেছিলেন। রাজধানী গড়তে চেয়েছিলেন গুজরাটের কচ্ছের মরুভূমি অঞ্চলে। উনি নেহেরু আর জিন্নার কাছে পাটকিলস্তানের রাজনৈতিক স্বীকৃতির জন্য আবেদনও করেছিলেন।

জিন্না হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু নেহেরু সোজা দিন কয়েকের জন্য ওনাকে রাঁচির পাগলখানায় আটকে রেখেছিলেন। উনি জানতেন যতদিন দেশে সুভাষ বোসের প্রভাব থাকবে ততদিন পাটকিলস্তান স্বপ্নই থেকে যাবে। লোকে বলে সুভাষ বোস নাকি ট্র্যাজিক নায়ক। ভুল কথা। ভারতের জাতীয় স্লোগান কি ‘জয় হিন্দ’। কে স্বীকৃতি দিয়েছিল? জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ওই গান কে পছন্দ করেছিল? গান্ধীজীকে জাতির জনক কে বলেছিল? নেহেরুকে প্রথম প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিঁড়িতে কে তুলে দিয়েছিল? উত্তর একটাই আসবে সুভাষ বোস। পাটকিল সাহেব জানতেন সুভাষ বোস মরেনি। কোথাও না কোথাও ঘাপটি মেরে বসে থেকে দেশ চালাচ্ছে।

যাইহোক সেই গান্ধীজী, নেহেরু, জিন্না, সুভাষ বোস – কেউই আর এখন প্লাটফর্মে নেই। সত্যভাই কাশীভাই পাটকিলও আজ আর নেই। ওনার স্বপ্নের রাজধানী পাটকিলনগর আজ মরুভূমির মধ্যে গুঁড়ো গুঁড়ো কিছু বালি। কিন্তু উনি পাটকিলস্তানের জন্য কয়েকটা নিয়ম করেছিলেন। ইতিহাসের বিখ্যাত বা কুখ্যাত হামুরাবির কোডের মত। দশটি অবশ্য পালনীয় কানুন। যা পুরাণ কাহিনীর ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ সিনাই পাহাড়ের পাথরের গায়ে ইহুদি জাতীর উদ্দেশ্যে Tঈশ্বরের দশটি নির্দেশকে মনে করিয়ে দেয়। সেগুলি আপনাদেরকে জানিয়ে দিই :

১। পাটকিলস্তান রাষ্ট্র প্রশাসনের সর্ব্বোচ্চ পদে থাকবেন জাতির জনক সত্যভাই কাশীভাই পাটকিল। তাঁর কাজে সাহায্য করার জন্য থাকবে তাঁর নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গঠিত পাটকিল জাতীয় পরিষদ। আইন, বিচার, ন্যায়, শৃঙ্খলা, সমাজ ও প্রশাসনের নজরদারীর দায়িত্ব ন্যস্ত থাকবে এই দুই স্তরের ওপরে। বিবাহ বা পারলৌকিক কাজের মত সামাজিক কাজ করার আগে জাতীয় পরিষদের অনুমতি আবশ্যিক করা হলো।

২। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রের নিকট সবার আগে দেশের ঐক্য ও সংহতি। সেই কারণে পাটকিলস্তানের সমস্ত নাগরিকের জন্য একটাই ভাষা নির্ধারিত করা হলো – পাটকিলি। সারা দেশের সমস্ত নাগরিকের নামের শেষে একটাই পদবি নির্ধারণ করা হলো – পাটকিল। এর অন্যথা হলে সেই নাগরিককে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হবে।

৩। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রের নিকট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে মহিলাদের সম্মান। একজন মহিলা কোনো পরিস্থিতিতেই নিজ গৃহদ্বারের বাইরে আসতে পারবেন না। বিবাহের পরে স্বামীর গৃহে যাবার জন্য এবং মৃত্যুর পরে আগুনে দগ্ধ হবার জন্য শুধুমাত্র দুই বার ওনারা সারাজীবনে দ্বার সীমা লঙ্ঘন করতে পারবেন। লজ্জ্বাহীনা নারীকে বিবস্ত্র করে সেনা ব্যারাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

৪। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রে মহিলাদের জন্য অক্ষর পরিচয় ও বিদ্যাচর্চা চরম অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আইন লঙ্ঘনকারী মহিলার চোখ উপড়ে নেওয়া হবে এবং তার সাহায্যকারীর জন্যও একই বিধান লাগু করা হবে।

৫। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি বাড়িতে মহিলাদের বাস করার জন্য স্বতন্ত্র একটি আলোহীন মহল রাখতে হবে। যেন কোনো আগন্তুক বাড়ির মহিলাদের দর্শন করতে না পারে এবং বাড়ির মহিলারা সেই অতিথিকে দেখতে না পায়। আইনঅমান্যকারীর শাস্তি নির্বাসন।

৬। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রে শুধুমাত্র ধর্মসঙ্গীত ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া যাবে। অন্য কোনো ভাবে গানের চর্চা করা যাবে না। কাব্যচর্চা অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। আইনঅমান্যকারীর চোখ উপড়ে নেওয়া হবে এবং জিহ্বা কেটে নেওয়া হবে।

৭। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রে ধর্ষণকারীকে আমৃত্যু জীবন্ত অবস্থায় শুধুমাত্র মুখমণ্ডল বাদে সম্পূর্ণ শরীর মরুভূমির বালিতে পুঁতে রাখা হবে। তার জন্য কোনো খাবার বা পানীয় বরাদ্দ করা হবে না। চুরি এবং চোরাকারবার করার শাস্তিও একইরকম।

৮। পাটকিলস্তান রাষ্ট্র মনে করে দুর্বল নাগরিক দেশকে দুর্বল করে দেয়। দেশের নাগরিকের কর্তব্য হবে দরিদ্র, শারীরিকভাবে অক্ষম ও পঙ্গু জনসাধারণকে চিহ্নিত করে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া। প্রশাসন দ্রুত এদের আরামদায়ক মৃত্যুর ব্যবস্থা করবে।

৯। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রে জাতির জনক বা পাটকিল জাতীয় পরিষদ বা সরকার বা সমাজের বিরুদ্ধাচরণ দেশদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হবে। শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

১০। পাটকিলস্তান রাষ্ট্রে উপরোক্ত এই দশটি নিয়মকে বলা হবে আধুনিক দশ নির্দেশিকা। রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিক ও পরিযায়ীদের এই নিয়মাবলী মানতে বাধ্য থাকতে হবে। অন্যথাকারীর জন্য দ্রুত ও কঠোর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।

এখন পাঠকবৃন্দ আপনারাই বিচার করুন। জাতীর জনক হিসেবে কাকে মানবেন? এই সুকঠিন লৌহ সঙ্কল্পের জাতীয়তাবাদী সত্যভাই কাশীভাই পাটকিলকে নাকি সুভাষচন্দ্র বোসের পছন্দের হাসি হাসি মুখের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে?

(অণুবীক্ষণ শুধুমাত্র অতিক্ষুদ্র বস্তুসমূহের সাথে মানুষের চোখের সংযোগ ঘটায়।)


চিরন্তন ভট্টাচার্য 22/04/2022

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *